দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র দেড় মাসের মাথায় মানুষটা গুম হয়ে গেলেন। দেশটা তার কাছে কোনো রাজনৈতিক দলের ছিল না, কোনো নেতার ছিল না—দেশটা ছিল মানুষের। পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সেই মানুষের কথাই তিনি বলেছেন তার লেখায়, তার চলচ্চিত্রে। ‘জীবন থেকে নেয়া’য় তিনি পাকিস্তানি স্বৈরশাসনকে সিনেমার পর্দায় দাঁড় করিয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কলকাতায় গিয়ে বানিয়েছিলেন ‘স্টপ জেনোসাইড’। নিজের শিল্পকে অস্ত্র বানিয়ে বাংলাদেশের গণহত্যার কথা পৌঁছে দিয়েছিলেন পৃথিবীর কাছে। ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২—তারপর আর কোনো দিন জহির রায়হানকে পাওয়া যায়নি। এমনকি তার লাশও না। সবচেয়ে আফসোসের বিষয় হলো পাকিস্তানের বর্বর সরকারও যাকে কিছু করতে পারে নাই, সেই মানুষটাকেই গুম করা হলো বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই। কেন? মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের অধীনে তখন একটি ফিল্ম অ্যান্ড পাবলিকেশন ডিপার্টমেন্ট ছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের গণহত্যা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরা ‘স্টপ জেনোসাইড’ বানাতে গিয়ে জহির রায়হান সেই দপ্তরের সহযোগিতা পাননি।
কলকাতায় অবস্থানরত একদল প্রভাবশালী আওমি নেতা তার বিরোধিতা করেছিল। (যদিও শেষ পর্যন্ত ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল।) অর্থাৎ আওয়ামী লীগের ক্ষমতাবান একটি অংশের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই। জহির রায়হানের পরিবারের সদস্যদের পরবর্তী স্মৃতিচারণে এসেছে, কলকাতায় ৯ মাস অবস্থানের সময় কারা দেশের জন্য কী করেছে, আর কারা নিজের আখের গুছিয়েছে—এসবের রেকর্ড তার কাছে ছিল বলে জহির নিজেই জানাইছেন। ববিতার একটি স্মৃতিচারণেও সে তথ্য পাওয়া যায়। সুচন্দার স্মৃতিচারণেও প্রেসক্লাবে দাঁড়িয়ে বড় বড় নেতার কলকাতার কর্মকাণ্ডের ডকুমেন্ট প্রকাশের কথা বলার বর্ণনা পাওয়া যায়।
ঢাকায় ফিরেই জহির জানতে পারেন তার ভাই শহীদুল্লা কায়সার বুদ্ধিজীবী হত্যার শিকার। জহির ঝাঁপিয়ে পড়লেন বুদ্ধিজীবী হত্যার রহস্য খুঁজতে। ‘বুদ্ধিজীবী নিধন তথ্য অনুসন্ধান কমিটি’র আহ্বায়ক হয়েছিলেন জহির রায়হান। তারা বুদ্ধিজীবী হত্যার বিভিন্ন সূত্র নিয়ে কাজ করছিলেন। প্রেসক্লাবের সংবাদ সম্মেলনে জহির বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের পরিচয় প্রকাশের দাবি তুলেছিলেন। যেদিন প্রেসক্লাবে জহিরের এমন একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শন করার কথা, যেখানে বুদ্ধিজীবী হত্যার রহস্য উন্মোচিত হবে। সেদিন সকালে জহিরের কায়েতটুলির বাসায় একটি ফোন এলো। ফোনদাতার নাম—রফিক। জহিরের প্রথম স্ত্রী সুমিতা দেবীর বর্ণনা অনুযায়ী, ফোনটি প্রথমে ধরেছিলেন জহিরের ছোট বোন। এরপর জহিরকে ফোন দেওয়া হয়। তাকে বলা হয় বড় ভাই শহীদুল্লা কায়সার মিরপুর ১২ নম্বরে জীবিত অবস্থায় বন্দী আছেন। তাকে বাঁচাতে হলে জহিরকেই এখনই যেতে হবে। জহির ছুটলেন মিরপুরে।
সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই জাকারিয়া হাবিব, চাচাতো ভাই শাহরিয়ার কবির, শ্যালক বাবুলসহ কয়েকজন।
মিরপুর ২ নম্বরে তাদের থামানো হয়। সেখানে তখন ভারতীয় সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ অবস্থান করছিল। নিরাপত্তার কথা বলে বাকিদের ফেরত পাঠানো হয়। জহির থেকে যান এবং সামরিক-পুলিশ অভিযানের সঙ্গে সামনে যান।
সেটাই ছিল জহির রায়হানের শেষ। আর এটা অনেকগুলো প্রশ্নের শুরু ছিল। ফোনকারী রফিক কোথায়? ফোনটা কেন করা হয়েছিল? শহীদুল্লা জীবিত—এই খবর রফিক পেল কোথায়? এবং সবচেয়ে বড় কথা—ঠিক যেদিন সন্ধ্যায় জহিরের প্রেসক্লাবে চলচ্চিত্র দেখানোর কথা, সেই দিন সকালেই কেন এমন একটি ফোন তাকে দেশের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাগুলোর একটিতে নিয়ে গেল? রফিককে নিয়ে জহিরের প্রথম স্ত্রী সুমিতা দেবীর বক্তব্য আরও ভয়ংকর। সুমিতা দেবী বলেছিলেন, রফিক তাদের পূর্বপরিচিত ছিলেন। জহির নিখোঁজ হওয়ার পর রফিককে নিয়ে পত্রপত্রিকায় আলোচনা শুরু হলে তাকে সপরিবারে আমেরিকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। জহিরকে গুমের ঘটনায় রফিকের ভূমিকা নিয়ে তার সন্দেহের কথাও তিনি স্পষ্ট করেছিলেন। সুমিতা দেবীর কথা থেকেই জানা যায়, একসময় জহিরের বড় বোনকে ডেকে পাঠান শেখ মুজিবুর রহমান। সুমিতা দেবীর ভাষ্য অনুযায়ী শেখ মুজিব তাকে বলেন—জহিরের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে এভাবে চিৎকার করলে তুমিও নিখোঁজ হয়ে যাবে। এরপর জহিরের বড় বোন ভয়ে আর কথা বলেননি। একটু চিন্তা করেন। একজন মানুষ হারিয়ে গেছে। তিনি এই দেশের অন্যতম বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার। মুক্তিযুদ্ধে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরতে বাংলাদেশের পক্ষে ক্যামেরা নিয়ে লড়েছেন। বুদ্ধিজীবী হত্যার তদন্ত করছেন। তার পরিবারকে যদি রাষ্ট্রপ্রধান বলে, বেশি কথা বললে তুমিও নিখোঁজ হয়ে যাবে, তখন জহির রায়হানের অন্তর্ধান শুধু একটা গুমের ঘটনা থাকে না। হয়ে ওঠে সেই সময়ের সরকারের চরিত্রের গল্প।
ঘটনার ২৭ বছর পর জহিরের ছেলে অনল রায়হানও অভিযোগ করেছিলেন—জহির নিখোঁজ হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার যে তদন্ত কমিটি করেছিল, সেটি ছিল ‘ভুয়া তদন্ত কমিটি’; তার ভাষায় কমিটি কোনো কাজই করেনি। আরও রহস্য আছে। জহিরের সঙ্গে বুদ্ধিজীবী হত্যা অনুসন্ধানের কাজে যুক্ত লেফটেন্যান্ট সেলিমও মিরপুরে গিয়ে নিখোঁজ হন। পান্না কায়সারের লেখায় পাওয়া যায়, বঙ্গভবনে সেলিমের কক্ষ থেকে তার কাগজপত্রও পাওয়া যায়নি। একই লেখায় তিনি উল্লেখ করেন, জহির নিখোঁজ হওয়ার পর বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি প্রোপ্যাগান্ডা অনেক অপপ্রচার শুরু করে। এসব দেখে ক্ষুদ্ধ হয়ে তিনি একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তার এই প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ পৃথিবীব্যাপী অনেক সাড়া ফেলে। এই প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পৈশাচিকতা সম্পর্কে বাইরের দেশগুলোতে ঘরে ঘরে মানুষ জানতে পারে। জহির রায়হান রাতারাতি দেশের বাইরে অনেক পরিচিতি পেয়ে যান। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা তখন তার সাক্ষাৎকার নিতে শুরু করে। নিচে কলকাতার একটি পত্রিকায় জহির রায়হানের দেওয়া সাক্ষাৎকারের একটা অংশ তুলে ধরা হয়েছে।
“আমি জহির রায়হান। আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত নই। আমি কেবল একজন লেখক এবং চলচ্চিত্রকার। কিন্তু আমি বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় দেখেছি। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো আমি কিছু পাকিস্তানি মিলিটারিদের একটা অপারেশনের সময় একটা মুভি ক্যামেরা হাতে রাস্তায় চলতে দেখতাম। তারা মানুষ গুলি করে মারার পর সেই মুভি ক্যামেরা দিয়ে মৃত লাশগুলোর ভিডিও চিত্র নিতো। ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়ার পর সেগুলোর ভিডিও চিত্র নিতো। তারা কিছু বাঙালিকে একত্র করে একটা দোকান লুট করতে বাধ্য করে। নিজেদের মুভি ক্যামেরা দিয়ে তারা সেই লুট করার ভিডিও চিত্র ধারণ করে। এরপর আমি শুনেছি এবং পরে নিজে দেখেছি যে তারা এই ধারণকৃত অংশগুলো ইডিট করে। এই ইডিট করা ভিডিওগুলো প্রেসে ছেড়ে দিয়ে বলে যে, বাঙালিরা অবাঙালিদের হত্যা করা শুরু করেছে। এই অরাজক ও বিভ্রান্তিমূলক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য তাদের (মিলিটারিদের)রাস্তায় নামতে হয়েছে। এটি ছিল পুরোপুরি একটা মিথ্যা বানোয়াট কথা।”
নিখোঁজ ভাইয়ের খোঁজে একদিন বাসা থেকে বেরিয়ে তিনি নিজেই হারিয়ে গেলেন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৭ই ডিসেম্বর জহির রায়হান ঢাকায় ফেরেন। ফিরে জানতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাক হানাদার বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইট চলার সময় রাজাকার আল বদর বাহিনী তার বড় ভাই প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারকে অপহরণ করেছে। মানুষ যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে নতুন করে গড়ার কাজে ব্যস্ত, তখন তিনি বিভিন্নভাবে নিখোঁজ ভাইকে খোঁজার অভিযান শুরু করেন। ১৯৭২ সালের ২৮শে জানুয়ারি সকালে এক রহস্যময় ব্যক্তি তাকে ফোন করে জানান যে, তার ভাইকে মিরপুর ১২ নাম্বারে একটি হাউজিং সেক্টরে আটকে রাখা হয়েছে। একথা শুনেই তিনি ভাইয়ের খোঁজে মিরপুর যান এবং আর ফিরে আসেননি।
জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে অনেক ধরনের থিওরি রয়েছে। এমন বলা হয় যে, তিনি একটি সার্চ পার্টি নিয়ে মিরপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে পাক হানাদার বাহিনীর কিছু সদস্য ছদ্মবেশে ছিল। তারা তাকে লুকিয়ে আটক করে হত্যা ও গুম করে ফেলে। তার ছোট ভাই হাবীবের ভাষ্যমতে, তিনি জহির রায়হানকে মিরপুর পুলিশ স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। এরপর আর তার দেখা পাননি। এমন খবরও শোনা যায় যে মিরপুর পুলিশ স্টেশন থেকে জহির রায়হানকে জানানো হয়েছিল, মিরপুর ১২ নাম্বারে কিছু পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকার ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে। সেখানে না গিয়ে আগে তাকে কল ট্রেস করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর তিনি নাকি ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ স্টেশন থেকে বেরিয়ে যান। আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময় আরো অনেক গুজব ছড়িয়েছে, যা আদৌ সত্যি না মিথ্যা, কেউ জানে না। তার মৃতদেহও কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার নিখোঁজ হওয়ার কোনো তদন্তের দিকেও কেউ কখনো আলোকপাত করেনি।
১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তার মৃত্যুদিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেদিন তিনি রহস্যময় ফোনকলটি বিশ্বাস না করে যদি ঘরে থেকে যেতেন, তাহলে হয়ত বাঙালি এই কিংবদন্তিকে এত অল্প বয়সে হারাতো না। আমরা হয়ত আরো অনেক কালজয়ী উপন্যাস এবং চলচ্চিত্র পেতাম।
তাহলে দাঁড়াচ্ছে কী? জহির রায়হান হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনায় হারিয়ে যান নাই। তিনি পরিকল্পিত গুমের শিকার হয়েছিলেন। আর ‘হাজার বছর ধরে’ বাংলাদেশের মানুষ যেমন জহির রায়হানের সিনেমা ও লেখাকে মনে ধারণ করবে, তেমনি তার গুমের ঘটনাকেও স্মরণ করবে। কারণ তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম গুম হওয়া ব্যক্তি।